ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলোর কথা আজকে খুব মনে পরছে । সেই ফেব্রুয়ারি থেকে আজকে অক্টোবর - আট মাস , কিন্তু এই সময়টা শুধুই আট মাস নয় -আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আট মাস । ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু তখন । আর দুই মাস পরেই ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা । মূলত পড়াশুনা , ক্লাস - কোচিং -সায়েন্স কংগ্রেস এইসব নিয়েই আছি তখন । এর মধ্যে একদিন সকালে পেপার খুলেই দেখলাম বাচ্চু রাজাকারের ফাসির রায় হয়েছে - বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ট্রাইব্যুনাল করে প্রথম কোন রাজাকারের ফাসির রায় দেয়া হল । খবর টা শুনে অনেক ভাল লাগছিল আসলেই । এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি এল । কাদের কসাই এর রায় সেদিন । ছোটবেলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প -উপন্যাস -ইতিহাস আমি অনেক পড়তাম , কাজেই অন্তরে তখন রাজাকারদের প্রতি তীব্র ঘৃণা । জামাতের হরতাল ছিল , কাজেই সারাদিন বাসায় । বই সামনে নিয়ে বসে আছি , কিন্তু অপেক্ষা করছি কখন রায়টা দিবে । মা কে জিজ্ঞেস ও করতে পারছিলাম না রায়ের ব্যাপারে । কারন মা এর সাথে এই ব্যাপার নিয়ে তখন তেমন ফ্রি ছিলাম না । মা আমার আগ্রহ টা কিভাবে নিবে , কি মনে করবে -নানা রকম চিন্তা আসছিল মাথায় । কাজেই মা কে জিজ্ঞেস করার চিন্তা বাদ দিলাম । কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আমার সাথে কথা বলার সময় মা ই বোমা টা ফাটাল - কসাই এর তো ফাসি হয়নাই , যাবজ্জীবন হয়েছে ।
মাথায় রক্ত উঠে গেল মুহূর্তেই । কিসের জন্য , কেন কিছু বোঝার অবস্থা ছিল না - শুধু মনে আছে সাথে সাথে নিজের রুমে এসে দরজা আটকে দিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম । মা অবাক হয়েছিল ব্যাপার টা দেখে , কিন্তু নিজেকে আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না । ইচ্ছা করছিল তখন ই রাস্তায় নেমে যাই , রাজাকারের ফাসির দাবি করি । আমি তখনও জানি না কি করতে পারি আমি , কি করা উচিত । শুধু বুঝতে পারছিলাম এর প্রতিবাদ করা উচিত । এরপর দিন খবরে শুনলাম শাহবাগে রাজাকারের ফাসির দাবিতে আমার মতই সাধারন মানুষেরা প্রতিবাদ করছে । ব্যাস , আমি আমার পথ নির্দেশনা পেয়ে গেলাম । বাবা যে কয়দিন বাসায় থাকেন না - আমার ঠিকানা শাহবাগ । দিনের পর দিন , রাতের পর রাত শাহবাগে পরে থেকেছি , স্লোগান দিয়েছি , দাবি জানিয়েছি - কখনও এতটুকু ক্লান্তি লাগে নি । একটা কথা উল্লেখযোগ্য , আমার মা কখনও আমাকে কোথাও একা যেতে দেন না কিংবা একে রেখে আসেন না । অনেক কাছের কোন আত্মীয়ের বাসায় ও না । কিন্তু শাহবাগে অনেক দিন -রাত আমি একা থেকেছি । তখনও শাহবাগের কাউকেই ব্যাক্তিগত ভাবে চিনি না । শুধু জানি এরা সবাই আমার সহযোদ্ধা , যেই দাবি আমরা জানিয়েছি সেই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না আমরা কেউ । এই আমাদের একমাত্র পরিচয় । আর এই পরিচয় এতটাই শক্ত আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছিল আমাদের সবাইকে যে অত্যন্ত অপরিচিত মানুষ গুলোই হয়ে উঠেছিলেন জন্ম -জন্মান্তরের আপন , এক ই পথের সহযোদ্ধা ।
এরমধ্যে একদিন বাসায় এসে আমার এককালীন বেষ্ট ফ্রেন্ড কে ফোন করে শাহবাগের কথা জানাই । দুইজন মিলে প্ল্যান করি যে কলেজ থেকে সবাই মিলে শাহবাগে যাব । সেইমত প্ল্যান চলতে থাকে । কখনো ভাবি নি এই কাজের জন্য শাস্তি হবে বা এই কাজ টা কেউ খারাপ চোখে দেখবে । আমার জীবনের কোন কিছুর জন্য যদি আমি নিজেকে নিয়ে গর্ব করি তাহলে সেটা হল শাহবাগে যাওয়ার জন্য শাস্তি পাওয়া । কলেজ থেকে সাময়িক ভাবে বহিষ্কৃত করা হয় আমাকে । মনে আছে সেসময় এতটুকু কাদি নি আমি , আসলে সত্যি কথা হল কি হচ্ছে কিছু মাথায় আসেনি তখন , খালি মনে হচ্ছিল কখন এই ঝামেলা শেষ হবে আর কখন আমি শাহবাগ যাব । যাই হোক , এই ঘটনার পর আর ও বেশি করে ভালবাসতে শুরু করি শাহবাগ কে । কোন কাজে বাধা দিলে সেই কাজের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ে , আমি তো তার ব্যাতিক্রম না । এর মধ্যে পেপার এ দেখি "ফেসবুক থেকে রাজপথে" নামক একটা কলাম । এরপর টেস্ট পেপার পড়ছি , উইকিপিডিয়া দেখে একটা জিনিস বুঝার চেষ্টা করছি -এসব এর আড়ালে চলতে থাকে আমার ব্লগিং -ফেসবুকিং ।
এক একটা ফাসির রায় হতে থাকে , এক এক বার আনন্দে ভাসতে থাকি আমরা গোটা জাতি । ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তখন অনেক মাস পেরিয়ে গেছে । মার্চ , এপ্রিল , মে , জুন - অনেক মাস ধরে চলছে অনলাইনে -অফলাইনে আমাদের এই আন্দোলন । এর ধারাবাহিকতায় এল গোলাম আজমের রায়ের দিন । পুরো জাতি আমরা পরম আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম এই রাজাকার কূল শিরোমণির ফাসির রায় শোনার জন্য । কিন্তু হতাশ হতে হল আমাদের কে । ফাসি না হয়ে হল যাবজ্জীবন । প্রতিবাদে ফেটে পরল গনজাগরন মঞ্চ । সেদিন এবং তার কিছুদিন পরের কিছু ঘটনায় আমার বাবার চেহারা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল । বাবা আমাদের বিপক্ষে , রাজাকারের ফাসি চাইছে না - ব্যাপার গুলো ঠিক মেনে নিতে পারতাম না । কিন্তু মন কে শক্ত করে মেনে নিয়েছিলাম । বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই স্থির করেছিলাম সেদিন । এরপর বাবার কাছ থেকে অনেকবার অনেক বাধা এসেছে শাহবাগে যাই কেন , রাজাকারের ফাসি চাই কেন , জামাত নিষিদ্ধ চাই কেন এসব ব্যাপারেই। কিন্তু কোনটাই আমাকে থামিয়ে দিতে পারেনি । বাধা এসেছে নিজের পরিবার থেকেই , কিন্তু বাধাকে অতিক্রম করেই বার বার শাহবাগে ছুটে গিয়েছি । বাবার বিরুদ্ধে যুক্তি তর্কের লড়াইয়ে প্রায় ই বাসায় আমাকে কিসের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা আমি ই জানি শুধু । এতকিছুর মধ্যেও মা আমার পাশে থেকেছেন । সব মেনে নিয়ে শাহবাগ কে আঁকড়ে ধরে থেকেছি রাজাকারের ফাসির জন্য ।
সময়ের ধারবাহিকতায় কেটে গেছে অনেক গুলো মাস । এর মধ্যে সাইদি , কামরুজ্জামান , মুজাহিদ এর ফাসির রায় হয়ে গেছে । গনজাগরন মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে তৈরি হয়েছে রাষ্ট্র পক্ষের আপিলের সুযোগ । গোলাম আজম , কদের কসাই এর জন্য সর্বনিম্ন শাস্তি ফাসি চেয়ে আপিল করা হয়েছে । একদিকে অনলাইনে , শাহবাগে আমরা আছি রাজাকারের ফাসির দাবি নিয়ে , অন্যদিকে আদালতে চলছে আইনি লড়াই । যোদ্ধা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ রা । একদিন আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীর সাথেও আমার রাগারাগি হয় শাহবাগ নিয়ে । সে রাজাকারের ফাসি চায়না , আমি আগে জানতাম না । যুক্তি দিয়ে , তর্ক করে তাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি , কিন্তু "চোরে না শোনে কভু ধর্মের কাহিনী । " সে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেয় - হয় গনজাগরন মঞ্চের সাথে থাকতে হবে না হয় তার সাথে । আমার কাছে আমার বাংলাদেশের চাইতে উপরে কেউ নয় । তাই নির্দ্বিধায় এমন একজনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও আমার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি , যার জন্য এক সময় মা এর সাথেও আমি অনেক খারাপ ব্যাবহার করেছি । এই বান্ধবীর জন্য কখনও কাদি নি , সে আর এখন আমাকে কাঁদানোর অধিকার রাখে না । আমাকে কাঁদাতে পারে শুধুই আমার বাংলাদেশ , আর কিচ্ছু না । ওর সাথে গত একবছরের স্মৃতি গুলো মনে পরলে কাদি না , শুধুই হাসি । বাংলাদেশের সাথে , গনজাগরন মঞ্চের সাথে কোন আপোষ নেই , নিজের বাবার জন্য ও না । বান্ধবি ত অনেক দুরের ব্যাপার ।
এরপর অনেকদিন পর শুনলাম সুখবর । কসাই এর আপিলের রায় হল । রায়টা হল ফাসির । এরপর সাকা রাজাকারের রায় । সেটাও ফাসির । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরকারের অবস্থান , শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের যোদ্ধাদের আট মাস ধরে অনলাইনে -অফলাইনে আন্দোলন , রাজীব - দীপ -শান্ত - জগত জ্যোতি - জাফর মুন্সিদের রক্ত - মা জাহানারা ইমামের আন্দোলন সব কিছুর বিজয় ঘোষণা করে এল কসাই এর ফাসির রায় । সেদিন কি পরিমান খুশি ছিলাম বোঝাতে পারব না । মনে হচ্ছিল আমার কলেজ , বাবা , বান্ধবী সবাইকে আমি উত্তর দিতে পেরেছি । আন্দোলন সফল হয়েছে । কসাই কাদেরের বিজয় চিহ্ন পরাজিত হয়েছে । কসাই এর ফাসির রায় হয়েছে । সেদিন বিজয় মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এতো শুধুই একটা মিছিল নয় । এ হল বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের পরাজয় ঘোষণা ।
কিছুদিন আগের আঘাত এখন অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি আমি । দশদিন প্রায় কলেজে যাই নি । গতকাল কপালের সেলাই খোলা হয়েছে - ভালই আছি এখন । সেলাই থাকা অবস্থায়ও শাহবাগে ঠিক ই ছুটে গিয়েছি কলেজে না গেলেও । গত আট মাসের কথা ভাবতে গিয়ে একটা কথাই মনে হচ্ছে তা হল আমরা পেরেছি । নভেম্বরের শুরুতে রাজাকার কাদের কসাই এর ফাসি কার্যকর হতে যাচ্ছে - আমরা পেরেছি । এক মাস , দুই মাস নয় - আটটা মাস পরিবার পরিজন থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন আমি । অনলাইন আর শাহবাগ বলতে গেলে এই নিয়েই আছি । কলেজের পরীক্ষা গুলো কোনোরকমে পাশ ধরে রাখা , পরীক্ষা বাদ দিয়ে হলেও শাহবাগে ছুটে যাওয়া , বাবার বিরুদ্ধে , পুরো কলেজের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানো সব কিছুর ই একটা সুন্দর সমাপ্তি হতে যাচ্ছে আর তা হতে যাচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজাকার কসাই কাদের এর ফাসি কার্যকরের মাধ্যমে । স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর হলেও আমরা রাজাকারের ফাসি কার্যকর করার পথে আগাচ্ছি । আর এক মাস মাত্র অপেক্ষা , চূড়ান্ত অপেক্ষা আর মাত্র এক মাসের জন্য । এসবের কিছুই বৃথা নয় । এর বিপক্ষে যে যাই বলুক না কেন , শাহবাগে আমাদের আন্দোলনের অনেক সুন্দর একটা মানে আছে - আর তা হল সারা বাংলার মানুষকে এক করে রাজাকারের ফাসির দাবিতে জাগিয়ে তোলা , বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন , শহীদ জননীর স্বপ্ন সফল করা । আর সেই স্বপ্ন সফলের জন্যই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি -কসাই এর ফাসি দেখার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে তাকিয়ে আছি । একটা নতুন শুরু , আজ যে বড় প্রয়োজন।।।।।।
জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু । জয় প্রজন্ম , জয় শহীদ জননী , জয় গনজাগরন মঞ্চ । জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের , জয় হোক স্বাধীনতার ।
মাথায় রক্ত উঠে গেল মুহূর্তেই । কিসের জন্য , কেন কিছু বোঝার অবস্থা ছিল না - শুধু মনে আছে সাথে সাথে নিজের রুমে এসে দরজা আটকে দিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম । মা অবাক হয়েছিল ব্যাপার টা দেখে , কিন্তু নিজেকে আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না । ইচ্ছা করছিল তখন ই রাস্তায় নেমে যাই , রাজাকারের ফাসির দাবি করি । আমি তখনও জানি না কি করতে পারি আমি , কি করা উচিত । শুধু বুঝতে পারছিলাম এর প্রতিবাদ করা উচিত । এরপর দিন খবরে শুনলাম শাহবাগে রাজাকারের ফাসির দাবিতে আমার মতই সাধারন মানুষেরা প্রতিবাদ করছে । ব্যাস , আমি আমার পথ নির্দেশনা পেয়ে গেলাম । বাবা যে কয়দিন বাসায় থাকেন না - আমার ঠিকানা শাহবাগ । দিনের পর দিন , রাতের পর রাত শাহবাগে পরে থেকেছি , স্লোগান দিয়েছি , দাবি জানিয়েছি - কখনও এতটুকু ক্লান্তি লাগে নি । একটা কথা উল্লেখযোগ্য , আমার মা কখনও আমাকে কোথাও একা যেতে দেন না কিংবা একে রেখে আসেন না । অনেক কাছের কোন আত্মীয়ের বাসায় ও না । কিন্তু শাহবাগে অনেক দিন -রাত আমি একা থেকেছি । তখনও শাহবাগের কাউকেই ব্যাক্তিগত ভাবে চিনি না । শুধু জানি এরা সবাই আমার সহযোদ্ধা , যেই দাবি আমরা জানিয়েছি সেই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না আমরা কেউ । এই আমাদের একমাত্র পরিচয় । আর এই পরিচয় এতটাই শক্ত আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছিল আমাদের সবাইকে যে অত্যন্ত অপরিচিত মানুষ গুলোই হয়ে উঠেছিলেন জন্ম -জন্মান্তরের আপন , এক ই পথের সহযোদ্ধা ।
এরমধ্যে একদিন বাসায় এসে আমার এককালীন বেষ্ট ফ্রেন্ড কে ফোন করে শাহবাগের কথা জানাই । দুইজন মিলে প্ল্যান করি যে কলেজ থেকে সবাই মিলে শাহবাগে যাব । সেইমত প্ল্যান চলতে থাকে । কখনো ভাবি নি এই কাজের জন্য শাস্তি হবে বা এই কাজ টা কেউ খারাপ চোখে দেখবে । আমার জীবনের কোন কিছুর জন্য যদি আমি নিজেকে নিয়ে গর্ব করি তাহলে সেটা হল শাহবাগে যাওয়ার জন্য শাস্তি পাওয়া । কলেজ থেকে সাময়িক ভাবে বহিষ্কৃত করা হয় আমাকে । মনে আছে সেসময় এতটুকু কাদি নি আমি , আসলে সত্যি কথা হল কি হচ্ছে কিছু মাথায় আসেনি তখন , খালি মনে হচ্ছিল কখন এই ঝামেলা শেষ হবে আর কখন আমি শাহবাগ যাব । যাই হোক , এই ঘটনার পর আর ও বেশি করে ভালবাসতে শুরু করি শাহবাগ কে । কোন কাজে বাধা দিলে সেই কাজের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ে , আমি তো তার ব্যাতিক্রম না । এর মধ্যে পেপার এ দেখি "ফেসবুক থেকে রাজপথে" নামক একটা কলাম । এরপর টেস্ট পেপার পড়ছি , উইকিপিডিয়া দেখে একটা জিনিস বুঝার চেষ্টা করছি -এসব এর আড়ালে চলতে থাকে আমার ব্লগিং -ফেসবুকিং ।
এক একটা ফাসির রায় হতে থাকে , এক এক বার আনন্দে ভাসতে থাকি আমরা গোটা জাতি । ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তখন অনেক মাস পেরিয়ে গেছে । মার্চ , এপ্রিল , মে , জুন - অনেক মাস ধরে চলছে অনলাইনে -অফলাইনে আমাদের এই আন্দোলন । এর ধারাবাহিকতায় এল গোলাম আজমের রায়ের দিন । পুরো জাতি আমরা পরম আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম এই রাজাকার কূল শিরোমণির ফাসির রায় শোনার জন্য । কিন্তু হতাশ হতে হল আমাদের কে । ফাসি না হয়ে হল যাবজ্জীবন । প্রতিবাদে ফেটে পরল গনজাগরন মঞ্চ । সেদিন এবং তার কিছুদিন পরের কিছু ঘটনায় আমার বাবার চেহারা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল । বাবা আমাদের বিপক্ষে , রাজাকারের ফাসি চাইছে না - ব্যাপার গুলো ঠিক মেনে নিতে পারতাম না । কিন্তু মন কে শক্ত করে মেনে নিয়েছিলাম । বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই স্থির করেছিলাম সেদিন । এরপর বাবার কাছ থেকে অনেকবার অনেক বাধা এসেছে শাহবাগে যাই কেন , রাজাকারের ফাসি চাই কেন , জামাত নিষিদ্ধ চাই কেন এসব ব্যাপারেই। কিন্তু কোনটাই আমাকে থামিয়ে দিতে পারেনি । বাধা এসেছে নিজের পরিবার থেকেই , কিন্তু বাধাকে অতিক্রম করেই বার বার শাহবাগে ছুটে গিয়েছি । বাবার বিরুদ্ধে যুক্তি তর্কের লড়াইয়ে প্রায় ই বাসায় আমাকে কিসের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা আমি ই জানি শুধু । এতকিছুর মধ্যেও মা আমার পাশে থেকেছেন । সব মেনে নিয়ে শাহবাগ কে আঁকড়ে ধরে থেকেছি রাজাকারের ফাসির জন্য ।
সময়ের ধারবাহিকতায় কেটে গেছে অনেক গুলো মাস । এর মধ্যে সাইদি , কামরুজ্জামান , মুজাহিদ এর ফাসির রায় হয়ে গেছে । গনজাগরন মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে তৈরি হয়েছে রাষ্ট্র পক্ষের আপিলের সুযোগ । গোলাম আজম , কদের কসাই এর জন্য সর্বনিম্ন শাস্তি ফাসি চেয়ে আপিল করা হয়েছে । একদিকে অনলাইনে , শাহবাগে আমরা আছি রাজাকারের ফাসির দাবি নিয়ে , অন্যদিকে আদালতে চলছে আইনি লড়াই । যোদ্ধা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ রা । একদিন আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীর সাথেও আমার রাগারাগি হয় শাহবাগ নিয়ে । সে রাজাকারের ফাসি চায়না , আমি আগে জানতাম না । যুক্তি দিয়ে , তর্ক করে তাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি , কিন্তু "চোরে না শোনে কভু ধর্মের কাহিনী । " সে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেয় - হয় গনজাগরন মঞ্চের সাথে থাকতে হবে না হয় তার সাথে । আমার কাছে আমার বাংলাদেশের চাইতে উপরে কেউ নয় । তাই নির্দ্বিধায় এমন একজনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও আমার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি , যার জন্য এক সময় মা এর সাথেও আমি অনেক খারাপ ব্যাবহার করেছি । এই বান্ধবীর জন্য কখনও কাদি নি , সে আর এখন আমাকে কাঁদানোর অধিকার রাখে না । আমাকে কাঁদাতে পারে শুধুই আমার বাংলাদেশ , আর কিচ্ছু না । ওর সাথে গত একবছরের স্মৃতি গুলো মনে পরলে কাদি না , শুধুই হাসি । বাংলাদেশের সাথে , গনজাগরন মঞ্চের সাথে কোন আপোষ নেই , নিজের বাবার জন্য ও না । বান্ধবি ত অনেক দুরের ব্যাপার ।
এরপর অনেকদিন পর শুনলাম সুখবর । কসাই এর আপিলের রায় হল । রায়টা হল ফাসির । এরপর সাকা রাজাকারের রায় । সেটাও ফাসির । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরকারের অবস্থান , শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের যোদ্ধাদের আট মাস ধরে অনলাইনে -অফলাইনে আন্দোলন , রাজীব - দীপ -শান্ত - জগত জ্যোতি - জাফর মুন্সিদের রক্ত - মা জাহানারা ইমামের আন্দোলন সব কিছুর বিজয় ঘোষণা করে এল কসাই এর ফাসির রায় । সেদিন কি পরিমান খুশি ছিলাম বোঝাতে পারব না । মনে হচ্ছিল আমার কলেজ , বাবা , বান্ধবী সবাইকে আমি উত্তর দিতে পেরেছি । আন্দোলন সফল হয়েছে । কসাই কাদেরের বিজয় চিহ্ন পরাজিত হয়েছে । কসাই এর ফাসির রায় হয়েছে । সেদিন বিজয় মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এতো শুধুই একটা মিছিল নয় । এ হল বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের পরাজয় ঘোষণা ।
কিছুদিন আগের আঘাত এখন অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি আমি । দশদিন প্রায় কলেজে যাই নি । গতকাল কপালের সেলাই খোলা হয়েছে - ভালই আছি এখন । সেলাই থাকা অবস্থায়ও শাহবাগে ঠিক ই ছুটে গিয়েছি কলেজে না গেলেও । গত আট মাসের কথা ভাবতে গিয়ে একটা কথাই মনে হচ্ছে তা হল আমরা পেরেছি । নভেম্বরের শুরুতে রাজাকার কাদের কসাই এর ফাসি কার্যকর হতে যাচ্ছে - আমরা পেরেছি । এক মাস , দুই মাস নয় - আটটা মাস পরিবার পরিজন থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন আমি । অনলাইন আর শাহবাগ বলতে গেলে এই নিয়েই আছি । কলেজের পরীক্ষা গুলো কোনোরকমে পাশ ধরে রাখা , পরীক্ষা বাদ দিয়ে হলেও শাহবাগে ছুটে যাওয়া , বাবার বিরুদ্ধে , পুরো কলেজের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানো সব কিছুর ই একটা সুন্দর সমাপ্তি হতে যাচ্ছে আর তা হতে যাচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজাকার কসাই কাদের এর ফাসি কার্যকরের মাধ্যমে । স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর হলেও আমরা রাজাকারের ফাসি কার্যকর করার পথে আগাচ্ছি । আর এক মাস মাত্র অপেক্ষা , চূড়ান্ত অপেক্ষা আর মাত্র এক মাসের জন্য । এসবের কিছুই বৃথা নয় । এর বিপক্ষে যে যাই বলুক না কেন , শাহবাগে আমাদের আন্দোলনের অনেক সুন্দর একটা মানে আছে - আর তা হল সারা বাংলার মানুষকে এক করে রাজাকারের ফাসির দাবিতে জাগিয়ে তোলা , বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন , শহীদ জননীর স্বপ্ন সফল করা । আর সেই স্বপ্ন সফলের জন্যই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি -কসাই এর ফাসি দেখার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে তাকিয়ে আছি । একটা নতুন শুরু , আজ যে বড় প্রয়োজন।।।।।।
জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু । জয় প্রজন্ম , জয় শহীদ জননী , জয় গনজাগরন মঞ্চ । জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের , জয় হোক স্বাধীনতার ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন