রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

মায়ের বক্ষ ঝাঁঝরা করিয়া হাসিয়াছে অট্টহাসি , বাঙালি হাসিবে পরাণ ভরিয়া দেখিয়া রাজাকারের ফাঁসি

মধ্যরাতে ঘুমের ঘোরে পাশে রাখা ডায়েরি টার দিকে হাত চলে যায় । নিস্তব্ধতার মাঝে অশান্ত আকুলতায় উল্টাতে থাকি পাতাগুলো । না , কোন নির্দিষ্ট ঘটনা খুঁজে বের করতে চাইছি না । চঞ্চল হাতে শুধু উল্টে যাচ্ছি প্রতিদিনের স্মৃতিগুলো । কিন্তু হটাত করে আমার হাত থেমে গেল কেন ? ঘুম থেকে তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছি । কোন পাতায় এসে থেমে গেলাম , নিতান্ত কৌতূহল বশতই লেখার দিকে তাকালাম । হ্যা ,আমি থেমে গিয়েছি সেই পাতাটায় এসে , যেটাতে আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবির সাথে আমার শেষ কথার স্মৃতিটুকু লেখা আছে । দিনটি ১৫ ই জুন , ২০১৩। গনজাগরন মঞ্চ নিয়ে সেদিন কলেজে তুমুল তর্ক হয় একসময়ের সবচেয়ে কাছের বান্ধবির সাথে ।
তার মতে , রাজাকারের ফাসি চাই - এটা কোন যৌক্তিক দাবি নয় , ৪২ বছর পর এই দাবি তোলার অর্থ নেই , ইত্যাদি নানা অভিযোগ । তাকে বললাম বিয়াল্লিশ বছর পর দাবি তোলার অর্থ নেই তাহলে এর চেয়ে আর ও অনেক বেশি সময় পর ও তো অনেক দেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে । কিন্তু সেই মেয়ে সেদিন কোন কথাই বুঝল না - তার ধারনা আমি ব্যক্তিগত কোন স্বার্থের জন্য শাহবাগ যাই !!! তাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিলাম সেদিন যে আমার এমন কি ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকবে যার জন্য আমি আমার বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়াব , প্রতিনিয়ত বাবার কাছে অপমান সহ্য করব , কলেজ থেকে সাসপেন্ড হব বারবার , কি এমন ব্যক্তিগত স্বার্থ যার জন্য আমি দিনের পর দিন , রাতের পর রাত শাহবাগে পরে থাকব ? হ্যা , একজন বাঙালি হিসেবে আমার এখানে স্বার্থ আছে অবশ্যই , একজন বাঙালি হিসেবে বাংলা মাএর ৪২ বছরের অপমানের প্রতিশোধ নেয়া আমার কর্তব্য । আজকে আমি যদি চুপ করে থাকি তাহলে হয়ত ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ভাল থাকতে পারব , কিন্তু বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব । আর এইজন্যই আমি শাহবাগ যাই , বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পেতে , বাংলা মাএর বুক থেকে ৪২ বছরের কলঙ্ক মুছিয়ে দিয়ে রাজাকার মুক্ত বাংলা গড়তে । অবশ্য আমার যে বান্ধবির কথা বলছি সে কিছুই মানতে চায় নি আমার কথা , সে আমাকে বলেছিল হয় গনজাগরন মঞ্চ থাকবে না হয় তার সাথে আমার বন্ধুত্ব । এক্ষেত্রে আমি নির্দ্বিধায় গনজাগরন মঞ্চকে বেছে নিয়েছিলাম কারন কোন ভালোবাসাই দেশের প্রতি ভালোবাসার উপরে স্থান পেতে পারে না । আগে কোন কারনে আমাদের দুইজনের মধ্যে মনোমালিন্য হলেই আমার কান্না কেউ থামাতে পারত না , কিন্তু সেদিন আমাকে সেই ভাষাও কাঁদাতে পারে নি , আমার বিশ্বাস থেকে টলাতে পারে নি। আমার মনে হচ্ছিল , আমি তো কাদতে আসি নি , আমি তো ফাসির দাবি নিয়ে এসেছি , এতোটুকু যদি সহ্য করতে না পারব তাহলে কিসের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি আমি ? সেদিন বাসায় এসে আমার কাছে লেখা ভাষার প্রত্যেক টা চিঠি কুটি কুটি করে ছিঁড়েছিলাম - কারন একজন শিবির সমর্থকের সাথে একজন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষের কোন রকম যোগাযোগ থাকতে পারে না ।


আজকে ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবার থামি গনজাগরন মঞ্চ সমর্থন করি বলে বাবার সাথে বিরোধিতার কথাগুলোতে । আমার কষ্টগুলো আমি জানি , বাইরে যতই কঠোর থাকি - চারপাশের এত বাধা আমাকে ভেঙ্গে দিতে অনেক চেষ্টা করে , অনেক বেশি কাঁদায় আমাকে । আমি মেয়ে বলে আমাকে কাঁদতে হয় , কারন কেউ খারাপ আচরন করলে আমি প্রতিবাদ করতে পারব না , প্রতিবাদ করলে দ্বিগুণ সহ্য করতে হবে । আমি শাহবাগের আন্দোলন কারী বলে আমাকে কাঁদতে হয় , কারন আমার বাবা , বেষ্ট ফ্রেন্ড , ক্লাসমেট , কলেজ , শিক্ষক সবার কাছে আমি অনেক ঘৃণার মানুষ । আমার বিজয় তাদের কাছে পরাজয় - আমার খুশির খবর তাদের কাছে কষ্টের খবর । নাহ , শাহবাগ আমাকে টাকা - পয়সা দেয় নি , বাড়ি - গাড়ি দেয়নি - আমাকে দিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস । নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে চিনে নেয়ার সাহস , দাবি আদায়ের রাজপথে স্লোগান তোলার , পরিবারের বাধাকে অস্বীকার করে মিছিলে , মানব বন্ধনে রাজাকারের ফাসির দাবি জানানোর শক্তি আমাকে দিয়েছে শাহবাগ । বন্ধু আর দেশের মধ্যে দেশ কে বেছে নিতে আমাকে শিখিয়েছে শাহবাগ , মধ্যরাতে মশালের আলোতে রাজপথ আলোকিত করে দাবি জানাতে আমাকে শিখিয়েছে শাহবাগ । শাহবাগ আমাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের তেজে জ্বলতে শিখিয়েছে দাবি আদায়ের পথে । শাহবাগ আমাকে বিদ্রোহী কবির বাণীর মত বিদ্রোহী ভাষা শিখিয়েছে । শাহবাগ আমাকে মানুষের তরে রক্ত দিতে শিখিয়েছে । শাহবাগে আমাকে দাবি আদায়ের পথে রাস্তায় ঘুমাতে , প্রেসক্লাবের সামনে রাতভোর হাঁটতে শিখিয়েছে । বন্ধু আর দেশ এর মধ্যে বন্ধুকে দূরে ছুঁড়ে দিয়ে দেশ কে আপন করে নিতে আমায় শিখিয়েছে শাহবাগ । বাবার বাধার মুখে কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমায় শিখিয়েছে শাহবাগ ।

আজকে কাদের কসাই এর হাতে বিজয় চিহ্নের পরিবর্তে আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে ভীত হয়ে কসাই এর কান্নাকাটির খবর শুনে আসলেই সব কষ্ট ভুলে গিয়ে বাঁধভাঙ্গা আনন্দে হেসে উঠি । হ্যা ,আমরা পেরেছি । আমাদের প্রত্যেকের অনেক বিসর্জনের মধ্য দিয়ে , অনেক রক্ত , রাজীব , দীপ , শান্ত , জগতজ্যোতি , জাফর মুন্সির রক্তের বিনিময়ে হলেও আমরা পেরেছি । কসাই এর হাতের বিজয় চিহ্নকে পরাজিত করতে পেরেছি , স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে পেরেছি । বাবা , বেষ্ট ফ্রেন্ড , কলেজ কর্তৃপক্ষ - সবার বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমি বিজয় অর্জন করতে পেরেছি । আমরা মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর হলেও স্বাধীন বাংলার মাটিতে রাজাকারের দম্ভকে ধুলিস্যাৎ করতে পেরেছি ।

জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু । জয় প্রজন্ম , জয় শাহবাগ , জয় গনজাগরন মঞ্চ । জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের , জয় হোক স্বাধীনতার ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন