বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া , রাজাকার - তুমি বাংলা ছাড়ো !

রেশমা তার ছোট্ট মেয়ে সুরমা কে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছে । আজকে শুক্রবার । ওরা আজকে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর দেখতে যাবে । সুরমা ক্লাস ওয়ান এ পড়ে। এর মধ্যেই দেশের ইতিহাস জানার ব্যপারে সে অনেক আগ্রহী । তাই জাদুঘরে যাওয়ার ব্যপারে তার উৎসাহের শেষ নেই। রাস্তায় আসতে আসতে মা এর কাছে সুরমা অনেক কিছুই জানতে পারে বাংলাদেশের ইতিহাস ,ঐতিহ্য ,মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো শুনতে সুরমার অনেক ভালো লাগে ,তার গর্ব হয় এরকম একটা দেশে সে জন্মগ্রহণ করেছে যে দেশটার রয়েছে এত রক্তমাখা ইতিহাস। তার আরও ভাল লাগে যখন সে দেখে তার মত ছোট ছোট শিশুরাও সেদিন মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বাংলার অকুতোভয় বীর সৈনিকদের সেবা দিয়ে , তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল ১৯৭১ এ তার মতই আরও অনেকে যারা বাংলাদেশ টাকে সুরমার মতই অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে। ১৯৫২ ,১৯৬২ ,১৯৬৬ ,১৯৬৯ ,১৯৭১ এর বীর শহীদদের কথা , বীর মুক্তিযোদ্ধদের কথা যতবার সে পড়ে ততবার গর্বে - আনন্দে তার বুক ফুলে ওঠে। ক্লাসের বিদেশী বন্ধুদের কাছে প্রিয় বাংলাদেশটাকে নিয়ে অনেক গর্ব সুরমার ,মাতৃরূপী এই দেশটাকে অনেক ভালোবাসে সে।

গাড়ি শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে পৌঁছে গেছে। সুরমা আর রেশমা গাড়ি থেকে নামে। ড্রাইভার কে চলে যেতে বলে ওরা জাদুঘরের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে রেশমা থেমে যায় ,জাদুঘরের সামনের এলাকাটিতে তার দৃষ্টি আটকে যায়। সহযোদ্ধাদের মুখগুলো ,সেই অবস্থান -মানববন্ধন - উত্তাল রাজপথ -স্লোগান সব এক নিমেষে রেশমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুরমার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে রেশমা বলে , সুরমা , তোর মনে আছে তোকে যে বলেছিলাম একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের আপামর জনতা যেমন দেশের জন্য লড়াই করেছিল , তেমনি কিছু কুলাঙ্গার নিজেদের দেশ টার বিরধিতাও করেছিল ? মনে আছে তোর সেই কুলাঙ্গার গুলার কথা ? সুরমা মাথা নাড়ে ।তার মনে আছে । মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গিয়ে বার বার সে এই ভেবে হোঁচট খেয়েছে যে বাংলাদেশের মানুষ হয়ে এই রাজাকাররা কিভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল ১৯৭১ এ , যখন সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।রেশমা বলতে থাকে , বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে একদল কুলাঙ্গার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। এরপর দেশ অগ্রসর হয় এক ভবিষ্যৎ বিহিন অন্ধকারের দিকে । রাজাকার নামক যে দানব গুলো ছিল  তারা মন্ত্রী হয় , গাড়িতে  স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়ায় ।১৯৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা , বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা জেলের গাড়ি থেকে সে দৃশ্য দেখতেন । মা জাহানারা ইমাম এই কুলাঙ্গার রাজাকার দের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন প্রথম । তিনি গন আদালর গঠন করে গন রায়ের ব্যবস্থা করেন যেখানে রাজাকার কুল শিরোমণি গোলাম আজমের ফাসির রায় দেয়া হয় । কিন্তু স্বাধীনতা বিরধি অপশক্তি তখন ক্ষমতায় । মা জাহানারা ইমাম কে হতে হয় দেশ ছাড়া । অনেক বছর পরে ২০১০ সালের দিকে আবার রাজাকারের বিচার কার্যক্রম শুরু হয় স্বাধীন বাংলার মাটিতে । এই বিচার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের কসাই এর রায় দেয়া হয়। কিন্তু রায় টা ফাসি না হয়ে হয় যাবজ্জীবন । বিজয় চিহ্ন দেখায় কাদের কসাই ...।।

তারপর ? সুরমা প্রশ্ন করে। সে বুঝতে পারছেনা কাদের কসাই নামক রাজাকার টা কিভাবে বিজয় চিহ্ন দেখানোর সাহস পেয়েছিল সেদিন । এরপর কি হয়েছিল তা জানার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে ওঠে ।এরপর ?রেশমার কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে রাজাকার মুক্ত বাংলা গড়ার ইতিহাস - এরপর আমরা বাংলার সাধারন মানুষ এই শাহবাগে অবস্থান নিলাম , রাজাকারের ফাসির দাবি নিয়ে , শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্বপ্ন সফল করার প্রত্যয় নিয়ে গঠিত হল গনজাগরন মঞ্চ। জেগে উঠল সারা বাংলাদেশ । পরিবার , কলেজ , চাকুরি - ব্যবসা সব জায়গায় নানা রকম বাধা অতিক্রম করেই সেইদিন আমরা স্বপ্নের সিঁড়ি নির্মাণের কাজে এগিয়ে এসেছিলাম । অনলাইন থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পরল সারা দেশে । ব্লগার দের দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কে আপন করে নিল বাংলার আপামর জনতা । যেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল , ৪২ বছর পর সেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আবার এক হল বাংলার মানুষ । স্লোগানে , মিছিলে কাপিয়ে রাখলে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর কে । এই আন্দোলনে স্লোগান দিতে দিতে শহীদ হন সহযোদ্ধা তরিকুল ইসলাম শান্ত , রাজাকারদের দল জামাত - শিবিরের আক্রমনে শহীদ হন দীপ , রাজীব , জগৎজ্যোতি , জাফর মুন্সি। আক্রমনের শিকার হন সহযোদ্ধা তুহিন , তন্ময় , রুহুল আমিন , আরিফ নূর । কিন্তু জামাতিরা , রাজাকার রা এই জনতার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে পারেনি । আর তার ফলশ্রুতিতেই আসতে থাকল একের পর এক বিজয় । কাদের কসাই এর আপিলের রায় হল ফাঁসির । কসাই এর বদলে সেদিন বাংলার আপামর জনতার হাতে বিজয় চিহ্ন। সেদিন সত্যি ই রাজাকার , জামাত - শিবিরের বিরুদ্ধে বাংলার জনতার বিজয় হয়েছিল । সেদিন থেকেই বাঙালি জামাত - শিবির রাজাকার দের জানিয়ে দিল , বাংলার মাটিতে রাজাকারের কোন ঠাই নেই। আজ , নয় কাল , নয় পরশু - বাংলার মাটিতে রাজাকারের ফাসি হবেই ।

ততক্ষনে সন্ধ্যা হয়ে গেছে । জাদুঘরে আজকে আর যাওয়া হল না রেশমা - সুরমার । মেয়ের হাত ধরে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে হাঁটতে থাকে রেশমা । তার চোখে ভাসতে থাকে বিজয় মিছিল করার সেই দিন টি - কাদের কসাই এর ফাসির রায়ের আনন্দে সহজদ্ধাদের হাতে হাত রেখে করা রাজপথ কাঁপানো সেই বিজয় মিছিল , সেই প্রিয় শাহবাগ , সেই প্রিয় রাজপথ । রাজাকার বিরোধী সেই আন্দোলনের এক সৈনিক রেশমা। আন্দোলনের মাধ্যমে তারা পেরেছে সুরমাদের জন্য রাজাকার - জামাত - শিবির মুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ে দিতে ।

আর যুগে যুগে দেশের স্বাধীনতার জন্য , মুক্তির জন্য , রাজাকার মুক্ত বাংলা গড়ার জন্য অসঙ্খ্য আন্দোলনের স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে বাংলাদেশ , মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সগৌরবে উড়তে থাকে বাংলার লাল- সবুজ পতাকা । শহীদ রুমি - বদি - আজাদ - আলতাফ মাহমুদ - জুয়েল , শহীদ জননী জাহানারা ইমাম , মা সাফিয়া বেগম- আকাশের এক একটি নক্ষত্র হয়ে স্নেহ- ভালবাসায় জড়িয়ে রাখেন নিজেদের জীবনের চেয়েও প্রিয় বাংলাদেশ টিকে । নবইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জেগে থাকেন শহীদ দীপ - রাজিব - জগতজ্যোতি - জাফর মুন্সি - শান্ত , জেগে থাকেন তুহিন - তন্ময় - রুহুল আমিন - আরিফ নূরেরা । আর সবার উপরে নবচেতনার সাথী হয়ে বেঁচে থাকে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর , বেঁচে থাকে জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান - কোটি বাঙ্গালির হৃদয়ের কণ্ঠস্বর হয়ে ।

জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু। জয় প্রজন্ম , জয় শাহবাগ, জয় গনজাগরন মঞ্চ। জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের , জয় হোক স্বাধীনতার ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন