রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

রক্তিম পতাকা , রক্তিম পার্বতী , রক্তিম ভালোবাসা

"আর যদি একটা গুলি চলে , আর যদি আমার লোক দের হত্যা করা হয় , তোমাদের সবার কাছে অনুরধ রইল , প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল । মনে রাখবা , রক্ত যখন দিয়েছি , রক্ত আর ও দেব - এদেশের মানুষ কে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ । এবারের সংগ্রাম , আমাদের মুক্তির সংগ্রাম - এবারের সংগ্রাম , স্বাধীনতার সংগ্রাম । জয় বাংলা " । - রেডিও তে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনছিল পার্বতী ।
তাদের বাড়ি হল টিক্কা খানের সৈন্যদের আড্ডাখানা । সকাল - বিকাল তার বাবা মাহফুজ খান কি যে এমন বৈঠক করে ঐ খাকি পোশাক পরা সৈন্য গুলোর সাথে , পার্বতী শত ভেবে চিন্তেও সেই রহস্য উন্মোচন করতে পারেনা । ১১ বছরের পার্বতীর মাথায় আসে না বঙ্গবন্ধু যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন , যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে লড়তে বলেছেন , তাদের সাথে পার্বতীর বাবার কি এমন দরকারি কাজ । সে আর ও লক্ষ্য করে , এলাকার মানুষ জন পার্বতীদের বাড়িটাকে কেমন যেন এড়িয়ে চলে , সব বাসায় লাল - সবুজ বাংলাদেশের পতাকা উড়লেও তাদের বাসায় উড়ে না।পার্বতীর জন্মের সময় তার মা মারা গিয়েছিল , মা এর স্নেহ সে কখনও পায়নি । বাবা কাদের সাথে হাত মিলিয়েছে তাও সে বুঝতে পারছে না। বান্ধবিরাও তাকে কেমন যেন এড়িয়ে চলছে। এড়িয়ে চলত না যদি না তার বাবা এই বাড়িতে আসতে হলে বোরখা পরে আসতে হবে এই ফতোয়া জারি না করতেন ।


২৫ শে মার্চ , ১৯৭১ । সকাল থেকেই কিসের যেন কানাঘুষা চলছে বাবা আর তার সহচর দের মধ্যে । পার্বতী তখন কিছু টের না পেলেও টের পেল রাতের বেলা , যখন গোলা - বারুদের আঘাতে কেঁপে উঠছে চারপাশ প্রতিমুহূর্তে । বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই বুঝতে পেরে পার্বতী লুকিয়ে লুকিয়ে তার ঘরের জানালা টা খুলে বাইরে তাকায় । সে দেখতে পায় রাস্তা জনপ্রাণী শুন্য , পাক আর্মির ট্যাংক রাস্তায় । ই পি আর ব্যরাক থেকে বাঙালি পুলিশেরা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন পাক বাহিনীকে । হটাত করে দরজায় ধাক্কার আওয়াজ শুনতে পায় পার্বতী । এত রাতে কে আসতে পারে ? বাবা দেখছে না কেন কে এসেছে ? এইসব সাত - পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাবার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় পার্বতী । দেখতে পায় দরজা ভিতর থেকে বন্ধ , ভিতরে ঐসব খাকি সৈনিকদের সাথে কিসব আলোচনায় বসেছে বাবা  পার্বতীর হটাত করে নিজের বাবা কে একটা পশু বলে মনে হতে থাকে। সে তাদের ঘরের দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলে দেখতে পায় একজন আহত বাঙালি সৈনিক  , পানির জন্য হাহাকার করছে । পার্বতী আর কিছু ভাবতে পারে না সেই মুহূর্তে । সৈনিক টিকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে সে । সেবাযত্ন করতে থাকে। এই সৈনিকের নাম নূর মোহাম্মদ । একটু সুস্থ হয়ে উঠে নূর মোহাম্মদ পার্বতীকে জানায় পাক বাহিনীর নৃশংসতার কাহিনী । পার্বতী বুঝতে পারে এবার যে তার বাবা যা করছে তা হল বাংলাদেশের সাথে বিরোধিতা , বঙ্গবন্ধুর সাথে বিরোধিতা , জয় বাংলার সাথে বিরোধিতা । এক মুহূর্তে মনস্থির করে ফেলে পার্বতী । ই পি আর সৈনিক নূর মোহাম্মদ কে সাথে নিয়ে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে সে রাতেই সে বের হয়ে যায় মাতৃভূমির মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের খোঁজে ।


দিন যায় , রাত আসে । রাত যায় , দিন আসে । পথে কোন গ্রাম পেলে ওরা আশ্রয় নেয় , অন্যথায় একটানা চলা । চলতে চলতে নূর মোহাম্মদ পার্বতীকে শোনায় তার সৈনিক জীবনের গল্প ,তার মাএর গল্প , ছোট বোন সায়মার গল্প । পার্বতী মুগ্ধ হয়ে শোনে আর হাঁটে । নিজের জীবনে বলার মত তেমন কাহিনী নেই তার । নূর মোহাম্মদ এর ছোট বোন সায়মা মারা গিয়েছিল পাকিস্তানিদের গুলিতে , ছয় দফা আন্দোলনের সময়। বোনটির কাহিনী বলতে বলতে নূর মোহাম্মদ এর দু চোখ জলে ভেসে যেতে থাকে । ঠিক সে মুহূর্তে পার্বতী নূর মোহাম্মদের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে - "ভাইয়া , আমি তোর সায়মা হব , নিবি আমাকে ? " ভাই - বোন দৃঢ় ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয় সেদিন থেকেই । একসাথে তারা সীমান্তে পৌঁছায় , ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়।  মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে শুধু নূর মোহাম্মদ ই না ,সব মুক্তিযোদ্ধারই আদরের ছোট বোন হয়ে যায় পার্বতী । সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাঝে মাঝেই তাদের অপারেশন থাকে । প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধাকে বোনের স্নেহ করার পাশাপাশি রণ ক্ষেত্রেও অপরিসীম দক্ষতার পরিচয় দেয় পার্বতী । এগারো বছরের কিশোরী মেয়ে এখন নিপুণ যোদ্ধা । এক একটা অপারেশনের সময় , এক একটা বিজয়ের পর পার্বতীর জয় বাংলা স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত টগবগ করে ওঠে।

নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় পার্বতীরা গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় প্রবেশ করে। ঢাকায় বিভিন্ন হাইড আউটে কাটতে থাকে তাদের দিন , চলতে থাকে অপারেশন । একদিন খবর আসে বুড়িগঙ্গার তীরে পাক বাহিনী শক্ত ঘাঁটি করে আছে। ওদের কে হারাতেই হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব । ছোট্ট দলটি রওনা হয়ে যায় বুড়িগঙ্গা পারের পাক ঘাঁটির উদ্দেশ্যে । পথেই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব ভাগ করে দেন  কমান্ডার । সেদিন রাতে পাক বাহিনীর ক্যাম্পের সামনে দেখা যায় এক সুন্দরী কিশোরীকে । পথ হারিয়ে ফেলেছে বলে পাক বাহিনীর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল সে। ক্যাম্পের দারোয়ান মেয়েটিকে মেজরের কাছে নিয়ে যায় । অল্প সময়ের মধ্যেই মেজরের সাথে ভাব জমিয়ে ফেলে মেয়েটি - ঠিক হয় সেই রাতে পাক বাহিনীর জন্য রান্নার ভার থাকবে মেয়েটির উপর । মেজর মনে মনে ভাবতে থাকে , রাতে মেয়েটির হাতে রান্না খাওয়ার পর মেয়েটিকে নিয়ে পৈশাচিক খেলায় মেতে উঠবে । এগুলো তো বাঙালি মেয়ে , ধর্ষণে তেমন কোন পাপ নেই । রাতে রান্না করা খাবারের মধ্যে বেশি করে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দেয় পার্বতী। খাওয়ার  পর ঘুমে ঢুলতে থাকে খাকি ইয়াহিয়ার সৈনিক আর রাজাকার রা । পার্বতী সঙ্কেত দেয়ার সাথে সাথে অসতর্ক পাক বাহিনীর উপর  অতর্কিতে হামলা চালায় মুক্তিবাহিনী । ঘুম আর নেশায় আচ্ছন্ন পাকিরা তেমন কোন প্রতিরোধ করতে পারেনা , পরাজিত হতে বাধ্য হয় , পাক বাহিনির ক্যাম্প সারি সারি পাক বাহিনির লাশে ভরে ওঠে মুক্তিবাহিনীর আক্রমনের কাছে টিকতে না পেরে । পার্বতী বাংলাদেশের লাল - সবুজ পতাকা নিয়ে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডের দিকে দৌড়ে যায় । কিন্তু হটাত করে এক রাজাকার গুলি ছোড়ে পার্বতীকে লক্ষ্য করে । গুলির শব্দ শুনে এদিকে ঘুরে তাকায় মুক্তিবাহিনীর সবাই। খুনি রাজাকার টাকে এক গুলিতে খতম করে পার্বতীর কাছে ছুটে যায় সবাই । পার্বতী কিছু একটা বলছে , সবাই শুনতে চেষ্টা করে। শুধু শুনতে পায় মৃত্যুর আগ মুহূর্তে পার্বতীর উচ্চারিত শেষ ধ্বনি ছিল - "জয় বাংলা ...।" বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে চলে গেল পার্বতী , মুক্তিযোদ্ধাদের কে দিয়ে গেল একটি রক্তিম পতাকা। সে রক্তিম পতাকা পার্বতীর পক্ষ থেকে তার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের প্রতি রক্তিম ভালোবাসা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন