বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৪

নতুন আশার নাম দিয়েছি প্রজন্ম চত্বর ...

ছিন্নভিন্ন কথাগুলোকে আবার সাজিয়ে নিতে খুব ইচ্ছে করে। কাঁদতে চাই, আমি প্রাণ খুলে কাঁদতে চাই। নীরবে- নিভৃতে দুই ফোঁটা অশ্রুজল ফেলা নয়, বধ্যভূমির সারি সারি শহীদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ -বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে চাই। কাঁদতে চাই অজ্ঞাতনামা সেই বীরদের স্মরণে। দুটো গোলাপের পাপড়ি নয়, এক বুক ভালোবাসায় ভরা রক্ত দিয়ে রাঙ্গাতে চাই সবুজ মেঠোপথ। হাতে রক্তলাল গোলাপ নিয়ে নয়, রাজাকারের রক্তে পুণ্যস্নান করে রক্তাক্ত দেহ নিয়ে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে পড়ন্ত বিকালের আলোয় দাঁড়াতে চাই শহীদ মিনারের পাদদেশে। রাজাকার কাদের কসাইয়ের ফাঁসির দিনের স্বর্গীয় আনন্দ আজো জাগ্রত অন্তরে। সে রকম কলঙ্কমুক্তির আনন্দে আবার ভাসতে চাই। এটা কোন প্রার্থনা নয়। এটা দাবি , এটা অধিকার। ত্রিশ লাখ শহীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। বীরাঙ্গনা মায়ের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। রক্তের বন্যায় চারপাশের প্রান্তর ভেসে যেতে হলে যাক, জীবনের মূল্যে হলেও বাংলা মায়ের কলঙ্কমুক্তি চাই। ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই।জয়... বাংলা...।

কি এক অমোঘ স্লোগান তাইনা!! কি এক অবিশ্বাস্য প্রাণের টান এই প্রজন্ম চত্বরের প্রতি।  রাতের নিকশ কালো আঁধার ভেদ করে সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে আছে কিছু পরপর।ব্যস্ত নাগরিক জীবনের যে এখনও সমাপ্তি হয়নি। চারপাশে অবিরাম জীবনের প্রবাহ আর সেই প্রবাহের মাঝে দাঁড়িয়েই একটু বৃত্তের বাইরে বের হবার চেষ্টা। কি আর করা, আমরা যে বাঙালি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়েও আমরা যে ঘুরে দাঁড়াই আর একবার বাঁচার জন্য, নতুন করে আর একবার স্বপ্ন দেখার জন্য। সত্যি,  আরেকবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার আশা খুঁজে পাচ্ছি ধীরে ধীরে। স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় রানা প্লাজার  ধ্বংসস্তূপে এখনও মিলতে থাকা মানুষের খুলি কিংবা সন্তানের মৃতদেহটা পাওয়ার আশায় অপেক্ষারতা মাতার করুণ মুখটি। তারপরেও আশায় বুক বাঁধি- বাংলাদেশের নিজস্ব  ড্রোণ বিমান আগামীকাল উড়তে যাচ্ছে আকাশে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতায়ও। আমার বাংলাদেশ আর কখনও পথ হারাবে না।

ত্রিশ লাখ শহীদের জন্য, দুই লাখ বীরাঙ্গনা মায়ের জন্য অশ্রুজলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তারপরেও আশায় বুক বাঁধি- কাদের কসাইয়ের ফাঁসি হয়েছে। বীরাঙ্গনা মায়েরা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেতে যাচ্ছেন। প্রজন্ম চত্বরের বর্ষপূর্তি সামনেই। চোখ থেকে অশ্রুটুকু মুছে ফেলতে হবে আজ। এমন খুশির দিনে যে কাঁদতে নেই। এ বর্ষপূর্তির আনন্দের সাথে যে মিশে আছে পৃথিবীর সুন্দরতম প্রতিশোধের আনন্দ।  কলেজের র‍্যাগ ডে এর দিন সবাইকে আনন্দ করতে দেখেছি; নিজে কিচ্ছু করিনি। সত্যি কথা, করতে পারিনি। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা যন্ত্রণা হচ্ছিল - একটা রাজাকারেরও ফাঁসি হলনা এখনও আর আমি আনন্দে মাতব? কেমন যেন অন্তর থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। সে কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম ১২ ই ডিসেম্বর। অন্তর থেকে তীব্র আনন্দের এক অনুভূতি পেয়েছিলাম রাত ১০ টা ১ মিনিটে। কেঁদেছিলাম, অতিরিক্ত আনন্দেই তো মানুষ কাঁদে। অশ্রু শুকিয়ে যাওয়া পাথরের বুক চিরেও তো স্রোতস্বিনীর প্রবাহ হয়। সেই আনন্দাশ্রুগুলোকে খুব মিস করছি আজ।  জাগরণযাত্রার অপেক্ষায় আছি, প্রজন্ম চত্বরের জাগরণযাত্রা...

রাস্তার সোডিয়াম লাইটগুলো নিভে যাক একে একে। নিচ্ছিদ্র আঁধারের পথে এদেরকে মনে হচ্ছে জ্বলন্ত শত্রু। শত্রুরা নিপাত যাক। নীরব এক মায়ার চাদরের মত অন্ধকার ঢেকে ফেলুক পৃথিবী নামক গ্রহটাকে। সিনেমা হলের কালো পর্দাগুলো একে একে পরে যাক। ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক বাতিগুলো নিভে যাক ধারাবাহিকভাবে। নাইট ক্লাবের নৃত্যরতরা আচমকা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুক পাথরের মূর্তির মত। আঁধার, শুধুই আঁধার ঘিরে ফেলুক চারপাশের সবকিছুকে। নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ুক মানবকুল। আর সেই নীরব- নিস্তব্ধ রাতের আঁধার ভেদ করে আকাশে দেখা দেক গোল থালার মত একটা রূপালী চাঁদ। নিকশ কালো আঁধারের মাঝে একটুখানি জায়গা হয়ে উঠুক মিষ্টি জোছনায় স্নান করা অপরূপা একখণ্ড বঙ্গভূমি। আর সে স্নিগ্ধ আলোয় আকাশ থেকে নেমে আসুক পরীর দল, সান বাঁধানো পুকুর থেকে সারি বেঁধে উঠে আসুক জলপরীরা আর সাগর থেকে মৎস্যকন্যারা। লক্ষ লক্ষ সেতারে একসাথে বেজে উঠুক সেই স্বর্গীয় সুর- "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।" সব সাহিত্যের পাতা ভেদ করে বাংলাদেশ কাঁপিয়ে আবারও বেজে উঠুক হৃদয়ে আগুন ধরানো অমর স্লোগান "জয় বাংলা..."

সবকিছুর পরও পরম আস্থার নাম প্রজন্ম চত্বর
আমার প্রজন্মের সুন্দর আর বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়
স্যাঁতসেঁতে, আর্তিময়, চেতনারহিত সময়ের বিরুদ্ধে
দীপ্ত, আকাশমুখী অথচ ছায়াচ্ছন্ন একটি নাম
"গণজাগরণ মঞ্চ"...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন